খুলনায় তরমুজ আছে, ক্রেতা নেই! দরপতনে কৃষকের মাথায় হাত।

ইবাংলা নিজস্ব প্রতিনিধি আড়তের একপাশে নিশ্চুপ বসা পরশ মন্ডল। অপেক্ষা তরমুজ বিক্রির। খুলনার দাকোপ উপজেলা থেকে ট্রাকে করে খুলনার কদমতলা ফলের আড়তে তরমুজ নিয়ে এসেছেন বিক্রির উদ্দেশ্যে। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও ক্রেতার দেখা মিলছে না। কখন তরমুজ বিক্রি হবে? আর বিক্রি হলেও কাংখিত মূল্য পাবে কিনা সেই দুশ্চিন্তায় নিয়ে আড়তে বসে রয়েছেন তিনি। একই অবস্থা অন্য আড়তগুলোতেও। সৈয়দ ভান্ডারে বসে ছিলেন কৃষক অসীত রায় ও সাগর গাইন। তারা দাকোপের কৌলাশগঞ্জ থেকে ট্রাকে করে তরমুজ নিয়ে এসেছেন। অর্ধেকেরও কম তরমুজ বিক্রি করতে পারলেও মেলেনি কাক্সিক্ষত মূল্য। লাভতো দূরের কথা উঠেনি গাড়ি ভাড়াও। শুধু পরশ, অসীত আর সাগরই নয়, একই অবস্থা খুলনার কদমতলা ফলের বাজারে আসা কৃষকদের। তাদের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ।
সরেজমিনে দেখা যায়, খুলনা মহানগরীর কদমতলা সর্ববৃহৎ ফলের আড়তে ট্রাক ভরে ভরে তরমুজ আসছে। বাজারে থাকা আড়ৎদারদের প্রতিটি ঘরে তরমুজে সয়লাব। অনেক চাষি ট্রাক থেকে তরমুজ নামাতে পারছে না বিক্রি না হওয়ায়। ফলে চাষিরা চরম বিপাকে পড়েছে। বিরূপ আবহাওয়া, সঠিক বিপণন ব্যবস্থার অভাব, পরিবহনণর সহজ লভ্যতা না থাকা এবং একটু দেরিতে তরমুজ তোলার কারণে চাহিদা কমেছে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

দাকোপ উপজেলার খোটাখালী গ্রামের পরশ মন্ডল বলেন, ক্ষেত থেকে তরমুজ কেটে ট্রাকে লোড দিয়ে আড়তে এসেছি লাভের আশায়। কিন্তু এখানে এসে ক্রেতার দেখা পায়নি।

তিনি বলেন, গতবছর ৪ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করে ২ লাখ টাকা কেনা-বেচা করেছিলাম। লাভও হয়েছিলো। লাভের আশায় এবার ৬ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। ফলনও ভালো হয়েছিল। কিন্তু বাজারে এসে দেখি বাজার খারাপ (দাম কম)। মূল্য কতো কি যে হবে তাও বলতে পারি না।
দাকোপের কৌলাশগঞ্জের কৃষক অসীত রায় বলেন, এ বছর প্রথম চার বিঘা জমিতে তরমুজের ক্ষেত করেছি। সব মিলিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আজ ১ হাজার ৮০০ পিস তরমুজ ২২ হাজার টাকায় ট্রাক ভাড়া করে নিয়ে আসছি। যার মধ্যে ৮৪৫টা তরমুজ বিক্রি করেছি ২১ হাজার টাকায়। লাভ তো দূরের কথা এখনও ট্রাক ভাড়ায় ওঠেনি। বাকী যে তরমুজ রয়েছে তা বিক্রি হবে কিনা সন্দেহ। আর ক্ষেতে যে কয়টা তরমুজ আছে তা আর বাজারে আনবো না, ক্ষেতেই নষ্ট হবে।
তিনি বলেন, খুলনা থেকে আশ্বাস দেয় তরমুজ ভালো দামে বিক্রি হবে, কিন্তু এসে দেখি অর্ধেক দামেও বিক্রি হয় না। ঈদের আগে ভালো দাম ছিল। গতবছর এক লাখ টাকা করে বিঘাপ্রতি তরমুজ বিক্রি করেছি, এ বছর ভেবেছি ৫০ হাজার টাকা পাবো। কিন্তু দাম নেই। এই ১৮০০ তরমুজের দাম গতবছর দেড় লাখ টাকা ছিল। লাভ তো দূরের কথা এবার খরচের টাকাও উঠবে না।
একই এলাকার সাগর গাইন বলেন, তরমুজের ক্ষেত করে গত বছর ৩০ হাজার টাকা লাভ করেছিলাম। এবারও লাভের আশায় সমিতি ও ব্যক্তির কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ক্ষেত করেছি। তবে লাভ তো দূরের কথা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এই ঋণ কিভাবে শোধ করবো তা বুঝতে পারছি না। মানসিক ভাবে টেনশনে দিন কাটাতে হচ্ছে।

নগরীর কদমতলা ফলের আড়তে তরমুজ কিনতে আসা বগুড়ার নন্দী গ্রামের বাসিন্দা শেখ রতন বলেন, আগে যে তরমুজ ১০-১২ হাজার টাকায় কিনেছি, এখন সেইটা ২ থেকে আড়াই হাজার টাকায় কিনেছি। চাষির কাছ থেকে প্রতি পিস ৩০ টাকা দরে কিনেছি। আড়ৎদারীসহ বগুড়া নিয়ে যেতে সর্বোচ্চ ৪৫ টাকা পিস পড়বে। এগুলো পাইকারি ৫০ থেকে ৬০ টাকা পিস বিক্রি করবো।
কদমতলা ফলের আড়তের সেলসম্যান গৌরঙ্গ কুন্ডু বলেন, বিরূপ আবহাওয়া ও ক্রেতা সংকটের কারণে চাষিরা তরমুজে পয়সা পাচ্ছে না। ফলে ধরা খেয়ে যাচ্ছে মূল উৎপাদনকারী চাষিরা। গাড়ি চালক, লেবার এরা পয়সা কম পাচ্ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চাষিরা।
তন্ময় ট্রেডার্সের আড়ৎদার এসএম সেলিম বলেন, চাষিরা বর্তমানে বিপদে পড়ে গেছে। ক্ষেতের থেকে মাল তুলে এনে বেচা-কেনা করে গাড়ি ভাড়ার টাকাও রিটার্ন পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতির কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তরমুজ একটু দেরি করে পেকেছে। এছাড়া বৃষ্টির কারণে এখন আর মানুষ বেশি তরমুজ খাবে না। এখন বাজারে আম ও লিচু এসে গেছে। এই জন্য তরমুজের চাহিদাও কমে যাবে। বাজারে তরমুজের সরবরাহ অনেক কিন্তু ক্রেতা নেই।
তিনি বলেন, চাষির মাল বিক্রি করে আমরা কমিশন পাই। চাষিদের মাল আসলে ক্রেতারা আগ্রহ করে কিনতে আসে। কিন্তু সেই মাল কেনার কাস্টমারই নেই মার্কেটে। এই কারণে চাষিরা বিপদে পড়েছে। সকালে ১০০ পিস তরমুজ ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করেছি, যে মাল ঈদের আগে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছিলাম। ক্রেতা না থাকার কারণ এই দরপতন বলে জানিয়েছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রতি পিস ২৫-২৭ টাকা দরে তরমুজ বিক্রি করতে হচ্ছে। এর মধ্যে গাড়ি ও লেবার খরচ দিয়ে প্রতি পিস তরমুজে চাষিরা ৫ থেকে ৭ টাকা করে পাচ্ছে। অথচ ঈদের আগে চাষি ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত পেয়েছে। চাষিদের ব্যাপক টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, এখানে প্রায় ২০০ ঘর রয়েছে। যেখানে ক্রেতা নেই, কিন্তু অসংখ্য তরমুজ পড়ে রয়েছে। বিক্রি না হওয়ায় অনেক তরমুজ নষ্ট হচ্ছে বলে একাধিক আড়ৎদার জানিয়েছেন। সেগুলো ফেলে দিতে হচ্ছে।
খুলনা জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অফিসের তথ্য মতে, এ বছর জেলায় ১৩ হাজার ৯৯০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে দাকোপে ৭ হাজার ৬২৫ হেক্টর, বটিয়াঘাটায় ৩৬০০ হেক্টর, পাইকগাছায় ১৫১০ হেক্টর, কয়রায় ৮৯৫ হেক্টর, ডুমুরিয়ায় ৩৫০ হেক্টর, রূপসায় ৫ হেক্টরে, তেরখাদায় ৩ হেক্টর ও ফুলতলা উপজেলায় এক এবং মেট্রো থানায় এক হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ হয়েছে।
খুলনা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ হাফিজুর রহমান ইবাংলা টিভি কে দেয়া সাক্ষাত কারে বলেন, খুলনায় এবার তরমুজের ব্যাপক আবাদ হয়েছে। গত বছরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ জমিতে তরমুজের চাষ হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে চাষিরা তরমুজের ভালো দাম পেয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তরমুজের দাম কিছুটা কম।

     More News Of This Category

ফেসবুক