ক্ষোভ থেকে নয়, নড়াইলে সাম্প্রদায়িক হামলার লক্ষ্য লুটপাট

নড়াইল প্রতিনিধিঃ নড়াইলের লোহাগড়া থানার দিঘলিয়া গ্রামের সাহাপাড়ায় হামলাকারীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুদের বাড়িঘরে লুটপাট। এমন অভিযোগ করেছেন ওই গ্রামের বাসিন্দারা।মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে একটি ফেসবুক পোস্টে আকাশ সাহা নামের এক কলেজছাত্রের ফেসবুক আইডি থেকে গত ১৪ জুলাই বিতর্কিত কমেন্ট করার অভিযোগ ওঠে। এর জের ধরে পরদিন বিকেলে হামলা চালানো হয় দিঘলিয়া গ্রামের সাহাপাড়ায়।হামলাকারীরা গ্রামের গোবিন্দ সাহা ও দিলীপ সাহার বাড়ি, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা অশোক সাহার দোকানসহ ১০টির বেশি বাড়ি-দোকান ভাঙচুর করে। গোবিন্দ সাহার বাড়িতে আগুনও দেয়া হয়।বিক্ষোভকারীরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি সাহাপাড়া মন্দিরের প্রতিমা, চেয়ার ও সাউন্ড বক্স ভাঙচুর করেন।গ্রামের রাধা গোবিন্দ মন্দিরের সভাপতি শীবনাথ সাহা ইবাংলাকে বলেন, ‘বিকেল ৪টার দিকে একদল ব্যক্তি এসে আকাশ সাহার বিচার দাবি করেছিল। তখন উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসে সব মিটমাট করে দেন। আকাশ সাহার বাবাকে থানায় নেয়া হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যায়।‘তবে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি দল মিছিল নিয়ে গ্রামে প্রবেশ করে। তাদের হাতে রেঞ্জ, লোহার রড জাতীয় বস্তু ছিল। পুলিশ তাদের নিবৃত্ত করার জন্য টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে। এতে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তবে এরপর তারা গ্রামের অভ্যন্তরের বাড়িঘর লুট করতে শুরু করে।’ওই সন্ধ্যায় একদল হামলাকারী ঢুকেছিল মালা রানী সাহার বাড়িতে।তিনি বলেন, ‘কয়েকজন তরুণ বয়সের ছেলে আমাদের বাড়িতে ঢোকে। আমি ও আমার ভাইয়ের মেয়ে বাড়ির পাকা ঘরটিতে আশ্রই নিই। সব লাইট বন্ধ করে খাটের তলায় গিয়ে লুকিয়ে থাকি।‘তারা এসে ওই ঘরের দরজার তালাতে লোহার রড় দিয়ে আঘাত করতে থাকে। ওরা বলছিল ঘরে যা আছে বের করে দে, তাহলে কিছু বলব না।’মালা রাণী বলেন, ‘আমরা ভয়ে কোনো কথা বলিনি। দুইজনে থর থর করে কাঁপছিলাম, আর ভগবানকে ডাকছিলাম। তারা যদি কোনো ভাবে দরজার তালা ভেঙে ফেলে, তাহলে আমাদের কী হবে?’‘এক পর্যায়ে তারা আমার আরেকটি ঘরের দরজা ভেঙে ফেলে। সেই ঘরের আলমারিতে থাকা ১৫ হাজার টাকা ও চার ভরি স্বর্ণের অলংকার লুট করে নিয়ে যায়।’হামলাকারীরা ঘরের ভেতরে সব মালামাল তছনছ করে জানিয়ে মালা রানী বলেন, ‘আমার দুটি ছেলে ঢাকার দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে। তাদের কাছে পাঠাতে ওই টাকাগুলো ধার করে এনে রেখেছিলাম। এখন তাদের দেয়ার মতো কিছু নেই।’হামলাকারীরা স্থানীয় দিঘলিয়া আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিলীপ কুমার সাহার বাড়িতেও লুটপাট চালায়।তিনি ইবাংলাকে বলেন, ‘আমার বাড়ি থেকে তারা ৬৫ হাজার টাকা ও কিছু স্বর্ণের অলংকার লুট করে নিয়ে গেছে। এছাড়া টিভি, ফ্রিজ ও ঘরের ভেতরে থাকা একটি প্রতিমা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।’দিলীপ কুমার সাহার প্রতিবেশী নিরাঞ্জন সাহা বলেন, ‘হামলাকারীরা আসার পর আমি একমাত্র সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে ছিলাম। তারা এসে আমার বাড়ির জানালাতে লোহার রড দিয়ে আঘাত করে বলে এক লাখ টাকা দে। টাকা দিলে তোদের বাড়ি ভাংচুর করব না।‘আমরা ভয়ে কেউ কথা বলিনি। তখন ভাঙা জানালা দিয়ে দেখতে পাই হামলাকারীরা দিলীপ সাহার বাড়ির দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকছে। ওরা বলছিল, টাকা ও স্বর্ণ ছাড়া আর কিছু নেয়ার দরকার নেই।’হামলার সময় গ্রামের গোবিন্দ সাহার বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। তার মা দীপালী সাহা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘প্রথমে এক দল ব্যক্তি এসে বাড়ির সব লুট করে নেয়। পরে দল এসে দেখতে পায় ঘরের দরজা ভাঙা, তেমন কিছু নেই। তখন তারা বলে, এদের বাড়িতে আগুন ধরাতে হবে।দিপালী বলেন, ‘ওরা চলে গেলে দেখতে পাই, ঘরের চালে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তখন আমি ও আমার ছেলে কাঁদতে শুরু করি। পাশের কিছু মানুষ এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে।’ওই দিন সন্ধ্যায় হামলাকারীরা গোপাল সাহাকে মারধরও করে। তিনি বলেন, ‘তারা এসে আমাকে বলে পাঁচ লাখ টাকা দে। টাকা না দিলে তোদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেব। এক পর্যায়ে তারা আমাকে মারধর শুরু করে। এতে আমার মাথা ফেটে যায়।’গ্রামের রাধা গোবিন্দ মন্দিরের সভাপতি শীবনাথ সাহা বলেন, ‘সবকিছু মিটমাটের পরেও সন্ধ্যায় হামলা হয়েছে। আকাশ সাহা ও তার বাবাকে আইনের আওতায় আনা হবে বলে সবাইকে আশ্বস্ত করেছিল প্রশাসন। এর পরেও সন্ধ্যায় হামলাকারীরা সম্ভবত লুটপাট করতেই এসেছিল।’হামলা ও লুটের ঘটনায় মামলাসাহাপাড়ায় হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা ও লুটের ঘটনায় লোহাগড়া থানার উপপরিদর্শক মাকফুর রহমান ২০০ থেকে ২৫০ জনের বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা করেছেন।এজাহারে বলা হয়, হামলাকারীরা এলাকায় কয়েকটা মন্দিরে ইট পাটকেল ছুড়ে মন্দিরের বাইরে রাখা ১০ থেকে ১৫ টি প্লাস্টিকের চেয়ার ভাংচুর করে।একই সঙ্গে তারা দিলীপ সাহার বাড়িতে ঢুকে ফ্রিজ, টিভি ভাংচুর করে ৩৫ হাজার টাকার ক্ষতিসহ নগদ ২০ হাজার এবং ৩ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায়।এজাহারে বলা হয়, হামলাকারীরা গোবিন্দ সাহার বাড়িতে ঢুকে দুটি ঘরের একটিতে আগুন দেয়। এতে এক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া শিব শংকরের বাড়ির আসবাব ভাংচুর করে ১০ হাজার টাকার ক্ষতিসাধন করা হয়।অশোক সাহার দোকানে হামলা ও অনুপম সাহার দোকান ভাংচুর লুটপাটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে এজাহারে। এছাড়া হামলা ও ভাংচুর হয়েছে গৌতম সাহার মিষ্টি দোকান ও সমীর পালের খাবারের দোকানে।লোহাগড়া থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ইবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার দিন আকাশ সাহাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনার বিষয়ে প্রশাসন আশ্বস্ত করলে সবাই চলে যায়। পরে কিছু জনগন উত্তেজিত হয়ে বাজারসহ সাহাপাড়ার বিভিন্ন এলাকায় অতর্কিত হামলা চালায়।’তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিনের বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে হামলাকারীদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্তে করে জনরোষ সৃষ্টিকারী ও হামলা-লুটের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।‘ইতোমধ্যে আমরা পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছি। তারা হলেন, সাইদ শেখ, রাসেল মৃধা, কবির গাজী, রেজাউল শেখ ও মাসুম বিল্লাহ। তারা লোহাগড়া থানার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।’গ্রেপ্তার পাঁচজনকে সোমবার তিন দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। মিজানুর রহমান বলেন, ‘রিমান্ডে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা যাবে।’লোহাগড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু হেনা মিলন ইবাংলাকে বলেন, ‘বেআইনি ভাবে বাড়িঘর, দোকান ও ধর্মীয় উপাসনালয় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, চুরি, ভীতি প্রদর্শন ও ক্ষতিসাধন যারা করেছে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।’

     More News Of This Category

ফেসবুক